সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস বেতনা নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া, দুই তীরের অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত স্লুইস গেট ব্যবস্থাপনায় নদীটি এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে সাতক্ষীরা শহরের পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে ‘বেতনা নদীর সুরক্ষায় নাগরিক উদ্যোগ ও রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্ব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা হাইকোর্টের রায় উল্লেখ করে বলেন, নদী একটি জীবন্ত সত্তা এবং একে রক্ষা করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড নাগরিক কমিটির সদস্য আমিনুর রসুল বলেন, বেতনা নদী এই অঞ্চলের মানুষের জন্য কেবল একটি জলপথ নয়, এটি এই জনপদের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার মূল ভিত্তি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, হাইকোর্ট নদী রক্ষায় স্পষ্ট নির্দেশনা দিলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অবিলম্বে বেতনাকে দখলমুক্ত করে এর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে সাতক্ষীরা ও যশোর অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
শিক্ষাবিদ আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে ও স্বদেশ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্তের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এসময় বক্তব্য রাখেন জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও বাপা সাতক্ষীরার সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাওবো ২) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আশিকুর রহমান,নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটির নেতা অধ্যক্ষ আশেক ই-এলাহী, সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি এ্যাড. বেলাল হোসেন, সাতক্ষীরা মহিলা পরিষদের জোৎস্না দত্ত, সাংবাদিক এম কামরুজ্জামান, লুইস রানা গাইন, শ্যামল বিশ্বাসসহ আরো অনেকে।
বক্তারা বলেন, যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ ইউনিয়নের কাছ থেকে উৎপন্ন হয়ে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি সাতক্ষীরার কলারোয়া, সদর, দেবহাটা ও শ্যামনগর হয়ে সুন্দরবনের মোহনায় মিশেছে। এক সময় এই নদী প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ ছিল। কিন্তু বর্তমানে নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে কলারোয়া ও সাতক্ষীরা সদর এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, নদীর প্রবাহ আটকে অবৈধ চিংড়ি ঘের তৈরি করায় মিঠাপানির চলন বন্ধ হয়ে গেছে এবং এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন।
আলোচনা সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অকার্যকর স্লুইস গেট এবং প্রভাবশালী মহলের নদী দখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা রুদ্ধ হয়ে গেছে। সভায় নদী রক্ষায় ৮ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আধুনিক ড্রেজিং পদ্ধতির মাধ্যমে নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত নিয়মিত পুনঃখনন নিশ্চিত করা, নদী রক্ষা আইন ২০১৩ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা এবং স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি ‘বেতনা নদী সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা। এছাড়া নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


0 মন্তব্যসমূহ